• Youtube
  • google+
  • twitter
  • facebook

নারী কেলেঙ্কারি : সেই ডিআইজি মিজানকে প্রত্যাহার

বরিশাল টাইমস রিপোর্ট৭:৩৭ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ৯, ২০১৮

অস্ত্রের মুখে তুলে নিয়ে বিয়ে করাসহ নানা অপকর্মের জন্য অভিযুক্ত পুলিশের ডিআইজি মিজানুর রহমানকে প্রত্যাহার করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। তাকে বর্তমানে পুলিশ সদর দফতরে সংযুক্ত করা হয়েছে।

মঙ্গলবার বিকালে মিজানকে প্রত্যাহারের বিষয়টি নিশ্চিত করেন পুলিশ সদর দফতরের এআইজি (মিডিয়া) সহেলী ফেরেদৌস।

এদিকে পুলিশ সপ্তাহ শেষে ডিআইজি মিজানের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করা হবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। সোমবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছিলেন- ডিআইজি মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে পুলিশের অভ্যন্তরীণ তদন্ত চলছে। তার অপরাধ প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নেয়া হবে। এর পরই মঙ্গলবার ডিআইজি মিজানকে প্রত্যাহার করল প্রশাসন।

ডিআইজি মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে এক নারী বলেন, পান্থপথের স্কয়ার হাসপাতালের কাছে তার বাসা। গত বছরের জুলাইয়ে সেখান থেকে কৌশলে তাকে তুলে নিয়ে গিয়েছিলেন পুলিশ কর্মকর্তা মিজান। পরে বেইলি রোডের মিজানের বাসায় নিয়ে তিনদিন আটকে রাখা হয়েছিল তাকে।

ওই নারীর দাবি, আটকে রাখার পর বগুড়া থেকে তার মা’কে ১৭ জুলাই ডেকে আনা হয় এবং ৫০ লাখ টাকা কাবিননামায় মিজানকে বিয়ে করতে বাধ্য করা হয়। পরে লালমাটিয়ার একটি ভাড়া বাড়িতে তাকে স্ত্রীর মর্যাদা দিয়ে রাখেন আগে থেকেই বিবাহিত মিজান।

ওই নারীর অভিযোগ, কয়েক মাস কোনো সমস্যা না হলেও ফেইসবুকে স্ত্রী পরিচয় দিয়ে একটি ছবি আপ করার পর ক্ষিপ্ত হন মিজান। ভাঙচুরের ‘মিথ্যা’ একটি মামলা দিয়ে তাকে গত ১২ ডিসেম্বর কারাগারে পাঠানো হয়। সেই মামলায় জামিন পাওয়ার পর মিথ্যা কাবিননামা তৈরির অভিযোগে আরেকটি মামলা করানো হয়। ওই মামলাতেও জামিনে বেরিয়ে এসে ডিআইজির বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলেন ওই নারী।

তবে মিজান এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, ওই নারী একজন প্রতারক।

এছাড়াও একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলের টিভি উপস্থাপিকার জীবন এই ডিআইজি বিষিয়ে তুলেছিলেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগে জানা যায়, ডিআইজি মিজানুর রহমান ফিল্মিস্টাইলে একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলের জনৈক সংবাদ পাঠিকাকে জোর করে গাড়িতে নিয়ে যাওয়ার সময় জনতার হতে ধরা পড়েন। খবর পেয়ে পুলিশ এসে তাকে জনতার হাত থেকে উদ্ধার করে। সম্প্রতি রাজধানীর কুড়িল বিশ্বরোড এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।

চাঞ্চল্যকর এ ঘটনার প্রায় ৭ মিনিটের ভিডিও ফুটেজে প্রায় অর্ধশত সাধারণ মানুষের উপস্থিতি দেখা যায়। এ সময় একজনকে বলতে শোনা যায়, ‘ডিআইজি মিজানকে জনগণ যাইতে দেয় নাই। পুলিশ এসে তাকে সেভ করে এবং ওই পুলিশ কর্মকর্তা গাড়ি নিয়ে সরে যান। পুলিশ না আসলে আমরা তাকে আটকাতে পারতাম।’ এতে দেখা যায়, ওই সংবাদপাঠিকা বেশ কয়েকজন পুলিশকে উদ্দেশ করে বলছেন, ‘এই ওসি সাহেব আপনি যেতে পারবেন না। আপনি কেন গাড়িটিকে যেতে দিলেন? এ সময় সিভিল ড্রেসে থাকা একজন পুলিশ সদস্যকে বলতে শোনা যায় আমরাতো কোনো গাড়ি পাইনি। তখন ওই সংবাদ পাঠিকা বলেন, ‘আপনারা আসার পরইতো ডিআইজি মিজানুর রহমান এখান থেকে পালাতে সক্ষম হয়।’

এ বিষয়ে ভুক্তভোগী সংবাদপাঠিকার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, গত ১২ ডিসেম্বর রাজধানীর কুড়িল এলাকায় দুর্ভাগ্যজনক এ ঘটনা ঘটে। তিনি বলেন, ডিআইজি মিজানুর রহমান আমাকে দেড় বছর ধরে ডিস্টার্ব করছেন। আমার বাসা, অফিস সব জায়গায় সাদা পোশাকে পুলিশ ডিউটি রেখে আমাকে অনুসরণ করা হয়। তার কারণে আমার সংসার তছনছ হয়ে যাচ্ছে। বাসায় গিয়ে আমার স্বামীকে গুলি করার হুমকি দেন।

কিভাবে অস্ত্রের মুখে তুলে নেয়া হয়েছিল জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি অফিস থেকে নিচে নেমে দেখি ডিআইজি মিজানুর রহমান নিচে দাঁড়িয়ে আছেন। একপর্যায়ে তিনি আমাকে দেখেই তার ব্যক্তিগত অস্ত্র ধরে বলেন, তোকে আজ মেরেই ফেলব। আমি বললাম, ঠিক আছে আমাকে মেরেই ফেলেন। কারণ এভাবে যন্ত্রণা আর সহ্য হচ্ছে না। এই জিহাদ (মিজানুর রহমানের গাড়িচালক) চলো আমাকে নিয়ে। দেখি কিভাবে গুলি করে মেরে ফেলা হয়। এই কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে তিনি আমাকে নিয়ে গাড়িতে ওঠেন। যাওয়ার সময় তিনি আমার মুখে মলম জাতীয় কিছু একটা খাওয়ানোর চেষ্টা করেন। একপর্যায়ে জিহ্বায় মলমটি লাগতেই আমার শরীর শিহরিত হয়ে ওঠে। আমি আস্তে আস্তে নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছিলাম। বিষয়টি বুঝতে পেরে আমি ডিআইজি মিজানকে বলি, এই তুমি আমাকে কী খাওয়াচ্ছ? তোমার উদ্দেশ্যটা কী। এ কথা বলতেই তিনি আমার গালে থাপ্পড় মারেন। এর পর আমি তার গাড়ির গ্লাস ভেঙে সাধারণ মানুষের সহযোগিতা চাই। কি মডেলের গাড়ি ছিল জানতে চাইলে সংবাদপাঠিকা বলেন, সেটি ছিল হেরিয়ার মডেলের গাড়ি।

ওই ভিডিওতে দেখা যায়, সংবাদপাঠিকাকে তুলে নেয়ার দৃশ্যের প্রত্যক্ষদর্শী একজনকে বলতে শোনা যায়, ‘টিভি চ্যানেলের এই সংবাদপাঠিকাকে তুলে নিয়ে যাচ্ছিলেন ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার পরিচয়ধারী মিজানুর রহমান। ওই সময় উপস্থাপিকার বাঁচাও বাঁচাও আর্তনাদ শুনে এলাকার মানুষ জড়ো হয়ে যায়। গাড়িটিও জ্যামে আটকা পড়ে। মহিলার চিল্লাচিল্লি শুনে গাড়িটি আটক করে তাকে উদ্ধার করা হয়।

ভিডিওতে স্থানীয় দুটি থানার ওসিসহ পুলিশের বেশ কয়েকজন সদস্যকে শতাধিক মানুষের উপস্থিতিতে সংবাদপাঠিকাকে উত্তেজিত ভাষায় কথা বলতে দেখা যায়। এ সময় থানার ওসিকে উদ্দেশ করে সংবাদপাঠিকাকে বলতে শোনা যায়, এই আপনি কোথায় যান? আপনি তো ডিআইজি মিজানকে ভাগিয়ে দিলেন। এ সময় আরেক প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, আমরা দেখলাম এই মহিলা (সংবাদপাঠিকা) চিল্লাচিল্লি করছেন। আমরা বললাম, এখানে কী হচ্ছে। তখন পুলিশের ওই বড় কর্মকর্তা (ডিআইজি মিজান) বলেন, আমরা আইনের লোক। তখন বললাম, আমরা পাবলিক। বিষয়টা বোঝার আছে। পরে আপু এখানে এলো। এ সময় পুলিশ কমিশনার আমাদের বলেন, তাকে (সংবাদপাঠিকা) মারার জন্য। তখন আমরা জিজ্ঞেস করলাম, তার অপরাধ কী? তখন ওই কমিশনার বললেন, উনি বেয়াদবি করেছেন। তখন আমরা বললাম, ম্যাডামকে মারার দরকার নেই। সাংবাদিকরা আসুক তারপর বিষয়টা দেখবে। আমরা সবাই বললাম, ওই গাড়িটা সাইট করে রাখার জন্য। পুলিশ আসার পর গাড়িটি দ্রুত সরিয়ে ফেলা হয়। পাবলিক দু’জনকেই গাড়ি থেকে বের করে আনে।

ভিডিওতে দেখা যায়, উত্তেজিত অবস্থায় টিভি উপস্থাপিকা বলেন, ‘একটা মিথ্যা পরিচয় দিয়ে ডিআইজি মিজান এখান থেকে পালিয়ে যায়। তিনি আমাকে অস্ত্র ঠেকিয়ে মারধর করেছেন। এই যে দেখেন আমার হাতে দাগ রয়েছে। এখানে সবাই সাক্ষী আমার গলায় অস্ত্র ঠেকিয়েছেন ডিআইজি মিজানুর রহমান। আমার মোবাইল ও ব্যাগ নিয়ে চলে গেছেন। তার বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ রয়েছে। তার সেকেন্ড ওয়াইফ রয়েছে। এগুলো নিয়ে আমার সঙ্গে ঝামেলা করছে। বিষয়টি আমাদের আইজি সাহেব জানেন, কমিশনারসহ সবাই জানেন। এক বছর ধরে আমি এটা নিয়েই অস্বস্তিতে আছি।

এদিকে অভিযোগ ওঠার পর আলোচনায় থাকা ঢাকার অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মিজানুর রহমানকে সোমবার দেখা যায়নি পুলিশ সপ্তাহের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে।

পুলিশ সপ্তাহ শুরু হলে রাজারবাগে সাংবাদিকসহ অনেকেই খুঁজতে থাকেন এই ডিআইজিকে। তবে রাজারবাগের অনুষ্ঠানে ঢাকা মহানগর পুলিশের ঊধ্বর্তন সব কর্মকর্তা উপস্থিত থাকলেও দেখা যায়নি অতিরিক্ত কমিশনার মিজানকে। তাকে দেখেছেন, এমন কোনো তথ্য কোনো পুলিশ কর্মকর্তা দিতে পারেননি।

রাজারবাগ থেকে প্রধানমন্ত্রী চলে যাওয়ার পর বেলা আড়াইটার দিকে মিজানকে ফোন করা হলে তিনি বলেন, “আমি রাজারবাগে আছি।” কোথায় আছেন- জানতে চাইলে ‘ব্যস্ত আছি’ বলে ফোন কেটে দেন তিনি।

লাইভ

টপ