• Youtube
  • google+
  • twitter
  • facebook

যুবলীগ নেতার ছেলের হয়রানিতে কলেজছাত্রীর পড়াশুনা বন্ধ!

বরিশাল টাইমস রিপোর্ট১:৩৪ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ৫, ২০১৭

প্রথমে স্কুলছাত্রীকে বিদ্যালয়ে যেতে বাধা। এসএসসি পরীক্ষা চলাকালে হামলা। যে কারণে সেই বছর পরীক্ষা শেষ করতে পারেনি মেয়েটি।

তবে পরের বছর পরীক্ষায় পাস করে কলেজে ভর্তি হয়েছে। এখন কলেজে যেতেও বাধা দেওয়া হচ্ছে। ৬ বছর ধরে ইভটিজিংয়ের (উত্ত্যক্ততা) শিকার পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার চরকাজল ইউনিয়নের এই কলেজছাত্রী।

অভিযুক্ত মিজানুর রহমান একই ইউনিয়নের রাজ্জাক রাঢীর ছেলে।

মিজানুরের ভগ্নিপতি মাসুদ খান পাশের রতনদি তালতলী ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক। স্থানীয়দের অভিযোগ- মেয়েটি তার চাচাত বোন।

জমি নিয়ে পারিবারিক বিরোধ থাকায় ছেলের বাবা ইভটিজিংকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছেন। সরকারি দলের রাজনীতি করায় এদের বিরুদ্ধে পুলিশ বা প্রশাসন কোনো ব্যবস্থা নেয় না।

খোঁজখবর নিয়ে জানা গেছে- মেয়েটির দাদা ২০০০ সালে মারা যান।

এরপর তাঁর দুই ছেলের মধ্যে জমির ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে বিরোধ হয়। বহুবার স্থানীয় লোকজন সালিস করলেও নিষ্পত্তি হয়নি। এই বিরোধের জের ধরে মিজানুর চাচাত বোনকে উত্যক্ত শুরু করে। তার লেখাপড়া বন্ধ করতে সপ্তম শ্রেণিতে থাকাকালে বিদ্যালয়ে আসা-যাওয়ার পথে উত্ত্যক্ত শুরু করে।

কখনো হাত টেনে ধরা, কাপড় টেনে ধরা, কখনোবা অশ্লীল মন্তব্য করে। মেয়েটি এ ঘটনা চাচা এবং স্থানীয় গণ্যমান্যদের জানায়। এতে মিজানুর বেপরোয়া হয়ে ওঠে।

বিষয়টি নিয়ে একাধিকবার স্থানীয়ভাবে সালিস দাবি করলেও এলাকার লোকজন ভয়ে চুপ হয়ে গেছে।

প্রতিদিনের উত্ত্যক্ত সত্ত্বেও ২০১৫ সালে মেয়েটি এসএসসি পরীক্ষার পূর্ণ প্রস্তুতি নেয়। রসায়নবিদ্যা পরীক্ষার আগের দিন দুপুরে বাড়ির উঠানে মিজানুর তাকে মারধর করে। ভয়ে কেউ এগিয়ে আসেনি। এতে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ে সে।

পরে তাকে তেঁতুলিয়া নদী পাড়ি দিয়ে গলাচিপা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয়। মিজানুরের হুমকির কারণে চিকিৎসা করাতে পারেনি তার পরিবার।

বাধ্য হয়ে তারা তাকে পটুয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করে। ৮ দিন চিকিৎসার পর সুস্থ হয় মেয়েটি। ওই বছর আর পরীক্ষা দিতে পারেনি সে।

এদিকে মেয়েটির বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবকসহ সর্বস্তরের মানুষ জোট বাঁধে মিজানুরের শাস্তির দাবিতে। তারা বিক্ষোভসহ মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করে কয়েক দফা। কিন্তু প্রশাসন ফিরেও তাকায়নি এ ঘটনার দিকে।

এমনকি গলাচিপা থানায় গেলে সরকারি দলের প্রভাবের কারণে মামলা নেয়নি পুলিশ। পরে আদালতে মামলা করলে জামিন নিয়ে স্বরূপে হাজির হয় মিজানুর। ওই মামলায় এক দিনও জেল খাটেনি সে।

মেয়েটির অসহায়ত্বের কথা বিবেচনা করে তার পাশে দাঁড়ায় বেসরকারি সংস্থা আভাস। তাকে আইনি সহযোগিতাসহ মানসিক শক্তি বৃদ্ধির জন্য ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে নিয়ে প্রশিক্ষণ দেয়। এর পরের বছর ২০১৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয় মেয়েটি।

বিজ্ঞান বিভাগে জিপিএ ৩ দশমিক ৮৩ পেয়ে ভর্তি হয় স্থানীয় কলেজে। কিন্তু বখাটে মিজানুর থেমে নেই। আগে বিদ্যালয়ে আসা-যাওয়ার পথে উত্ত্যক্ত করত, এখন কলেজে আসা-যাওয়ার পথে উত্ত্যক্ত করে।

সর্বশেষ গত বুধবার মেয়েটিক বাড়ির সামনে অশ্লীল ভাষায় গালাগাল করে। একপর্যায়ে ধাওয়া করলে মেয়েটি দৌড়ে ঘরে গিয়ে আশ্রয় নেয়।

ওই স্কুলছাত্রী জানিয়েছে, ‘প্রশাসনের কাছে আমার দাবি, মিজানুরের যন্ত্রণা অসহনীয়। আমাকে সে মেরেই ফেলেছিল। আমি বেঁচে গেছি। জমি নিয়ে বিরোধ আছে। কিন্তু আমার লেখাপড়ায় বাধা দেওয়া এবং আমাকে সব সময় সর্বত্র উত্ত্যক্ত করার অধিকার তার নেই। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং প্রশাসনের কাছে আমার অনুরোধ, আমি মিজানুরের যন্ত্রণা থেকে মুক্তি চাই।

তার সব অপরাধের শাস্তি চাই। আমিও একজন মানুষ, শান্তিপূর্ণভাবে সমাজে বসবাস করতে চাই। শিক্ষাজীবন শেষ করতে চাই। ‘

তবে সকল অভিযোগ অস্বীকার করে মিজানুরের বাবা রাজ্জাক রাঢ়ী বরিশালটাইমসকে বলেন, ‘আমার ছেলে আমার ভাতিজিকে উত্ত্যক্ত করে এই কথাটা সম্পূর্ণ মিথ্যা। কখনোই উত্ত্যক্ত করেনি। তবে একবার তাকে মারধর করেছিল। আমি তখন ছেলেকে ধমক দিয়েছি।

তিনি আরও বলেন, আমি আওয়ামী লীগ করি। কোনো পদ-পজিশন নেই। তবে এলাকার মানুষ যথেষ্ট ইজ্জত-সম্মান করে এবং সালিস-বিচারে ডাকে।

মিজানুরের ভগ্নিপতি যুবলীগ নেতা মাসুদ খান বরিশালটাইমসকে বলেন, মেয়েটি বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। এ রকম কোনো ঘটনাই ঘটেনি। ‘

এ বিষয়ে চরকাজল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. সাইদুর রহমান মোল্লা বরিশালটাইমসকে বলেন, ‘দুই ভাইয়ের মধ্যে সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ রয়েছে। এর সূত্র ধরে এক ভাইয়ের ছেলে আরেক ভাইয়ের মেয়েকে উত্ত্যক্ত করছে। ছেলেটি বখাটে। ‘

গলাচিপা থানার পরিদর্শক মো. জাহিদ হোসেন বরিশালটাইমসকে বলেন, ‘আমরা তদন্ত করেছি। ঘটনাটি জমির বিরোধ নিয়ে শুরু হয়েছে। মেয়েটিকে সার্বিকভাবে সহযোগিতা করছি।

গলাচিপা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. তৌছিফ আহমেদ বরিশালটাইমসকে বলেন, ‘আমি নতুন এসেছি। কেউ আমাকে এ বিষয়ে অভিযোগ দেয়নি। লিখিত অভিযোগ পেলে মেয়েটির পক্ষে সার্বিক সহযোগিতা করব।’

লাইভ

টপ