• Youtube
  • google+
  • twitter
  • facebook

মেয়ে, তুমি মানুষ গড়ার কারিগর? ছিঃ!

ফারজানা আক্তার৫:৩৪ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২১, ২০১৭

প্রতিবছর এসএসসি, এইচএসসি আর বিভিন্ন মেডিকেল-ভার্সিটি পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর কিছু মেধাবীর দেখা পাই আমরা। পত্রিকাগুলোতে বড় করে লেখা হয় ‘অদম্য মেধাবীদের গল্প’…। এই মেধাবীরা কেউ রিকশাওয়ালার ছেলে, কেউ কামারের ছেলে কেউবা আবার ভিক্ষুকের। ভিক্ষুকের ছেলে-মেয়েকে জীবনে সফল হতে দেখেছি, প্রতিষ্ঠিত হতেও দেখছি। কিন্ত সমাজের সফল ও প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিদের মা’কে এই প্রথম ভিক্ষুক হতে দেখলাম।

‘অসম্ভবকে সম্ভব করতে’ পারা লোকের সংখ্যা আমাদের সমাজে লাখে একজন কি দু’জন হতে পারেন। তবে তারা কী সম্ভব করতে পারেন আর পারেন না তার কিন্তু সীমাবদ্ধতা থাকে। কিন্তু যদি এমন কয়েকজন মানুষের দেখা পাওয়া যায়, যারা সবাইকে ‘তাক’ লাগিয়ে দেয়া অসম্ভবকে সম্ভব করেছেন। আর তারা যদি একই মায়ের গর্ভের হয় তাহলে তা নিয়ে সীমাহীন কৌতুহল হতেই পারে।

হ্যাঁ, আমরা এবার সবাইকে ভয়ঙ্করভাবে ‘চমকে’ দেয়া অসম্ভবকে সম্ভব করা তিন পুলিশ কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ীসহ প্রধান শিক্ষিকাকে দেখলাম। যারা গোটা দেশটাকে চমকে দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে সজোরে চপেটাঘাতও করেছেন গালে-মুখে। যে মায়ের রক্তে মাংসের মানুষ হয়েছেন, সেই মাকেই ছয় ভাইবোন মিলে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছেন রাস্তায়। যে মায়ের ঠাঁই হয়েছে রাস্তার পাশে ঝুপড়ি ঘরে। একমুঠো ভাতের জন্য যাকে হাত পাততে হয়েছে দ্বারে দ্বারে। বিনা চিকিৎসায় যিনি মরে যেতে বসেছিলেন।

আমার বিশ্বাস, ‘ভিক্ষুকের অদম্য মেধাবী সন্তানদের’ এই দেশে সবচেয়ে হতভাগ্য বোধ হয় ছয় সন্তানের জননী এই মা, যার নাম মনোয়ারা বেগম। যে মায়ের বড় ছেলে ফারুক হোসেন পুলিশের সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই), মেজ ছেলে জসিম উদ্দিন পুলিশ সদস্য, আরেক ছোট ছেলে নেছার উদ্দিনও এএসআই)। অন্য দুই ছেলে শাহাবউদ্দিন ব্যবসা আর গিয়াস উদ্দিন ইজিবাইক চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন। একমাত্র মেয়ে মরিয়ম সুলতানা একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা। এক কথায় বলতে গেলে মনোয়ারা বেগম নিশ্চিত রত্নগর্ভা মা।

কিন্তু রত্নগর্ভা কথাটা আমার মুখে আর মনে এলে একটা মুখই শুধু মনে পড়ে। একটা সুন্দর টাঙ্গাইলের শাড়ি গায়ে জড়ানো নারী। চোখে মোটা লেন্সের চশমা। মাথায় ছোট্ট ঘোমটা। সলাজ ভঙ্গিতে বসে আছেন চেয়ারে। সামনে বসে থাকা কোনো তরুণ বা তরুণীর প্রশ্নের টুকটাক উত্তর দিচ্ছেন। মাঝে মাঝে আনন্দে হেসে ফেলছেন মাঝে মাঝে আনন্দে কাঁদছেনও।

ছোটবেলা থেকে রত্নগর্ভাদের নিয়ে করা অনুষ্ঠানগুলোতো এমনই দেখে এসেছি। কিন্ত আজ দেশ তো আরো এগিয়ে গেছে। দেশ এনালগ থেকে ডিজিটালও হয়ে গেছে। না হলে রত্নাগর্ভা মায়েদের কপালে এমন দুর্ভোগ কী করে হয়?

গতকাল আমার সিনিয়র কলিগ ‘ভিক্ষা না করলে খাবার জোটে না ২ পুলিশ কর্মকর্তার মায়ের’ – এই খবরটা দেখে আমাকে বললেন, ‘আচ্ছা ফারজানা, এমন কেন হচ্ছে বলেন তো?’ আমি বললাম মাথায় কিছুই তো আসছে না। আপনার কী মনে হয় ভাইয়া? সিনিয়র কলিগ বললেন, ‘ছেলের বউদের জন্যই এমন হচ্ছে বলে তো মনে হয়!’ সঙ্গে সঙ্গে ভাইয়ার মন্তব্যের প্রতিবাদ করলাম। ছেলে যদি ঠিক থাকে ছেলের বউ এক চুলও নামাতে পারবে না। ছেলে যদি কৃতজ্ঞ সন্তান হতো, মায়ের প্রতি তার ভালোবাসা, সম্মান আর দায়িত্ববোধ থাকতো তাহলে ছেলের বউ যতই ‘কানপড়া, চোখপড়া’ দেখ না কেন কিছুই করতে পারবে না।

হতভাগ্য মা মনোয়ারা বেগমের পুত্রবধূরা হয়তো খারাপ; মেনে নিলাম। কিন্তু তার তো একটা মেয়েও আছে। তাহলে তিনি কেন তার মাকে দেখলেন না? আজ খবর পড়ে জানলাম, মেয়েটির নাকি সংসার সামলে সময়ই হয় না মায়ের খোঁজ নেয়ার। ততো বেশি বেতনও পান না যে মায়ের জন্য খরচ করবেন! আচ্ছা আপনিই ভাবুন তো, মেয়ের এ কথাটা কতটা যুক্তিপূর্ণ? নিজের মেয়েই যখন একথা বলেন তখন পরের মেয়ে কী বলবেন?

আমাদের ধারনাটাই এমন হয়ে গেছে যে, সংসারে কোনো ঝামেলা মানেই ছেলের বউ করেছে। চোখ বন্ধ করে ছেলের বউয়ের দোষ সবাই দিয়ে দেবে। ছেলেরা যেমনই হোক, মেয়েরা নিজ বাবা-মায়ের খুব আপন হয়। কিন্ত এই হতভাগ্য মায়ের মেয়েকে দেখে আমার সেই ধারনাটাও পাল্টে গেল। এমন যুক্তিহীন কথা আমরা অক্ষরজ্ঞানহীন মানুষের মুখেও শুনি না। তিনি আবার মানুষ গড়ার কারিগর! ছিঃ!

পুলিশ তো জনগণের বন্ধু। বিপদের দিনে এদের কথা মাথায় আগে আসে। তেনারা আমাদের নিরাপত্তার কারিগর। যে মানুষগুলো নিজের মায়ের নিরাপত্তা দিতে পারে না, নিজের বেহেশতের সুরক্ষা করতে পারে না, নিজের মায়ের ভরণপোষণ নিতে পারে না, সে মানুষগুলো আমাদের কী নিরাপত্তা দেবে?

তিন পুলিশ ভাই মিলে এক মায়ের পাশে দাঁড়াতে পারে না, হাত বাড়িয়ে দিতে পারে না, সেই তিন ভাই কীভাবে ১৬ কোটি মানুষের বন্ধু হবে? যে মেয়ে মায়ের জন্য এতোটুকু সময় বের করতে পারেন না, একমুঠো ভাতের জন্য যার মাকে দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হয় তিনি কী করে মাকে ভালোবাসার শিক্ষা দেবেন কোমলমতি শিশুদের? ধিক তোমাদের!

লাইভ

টপ