• Youtube
  • google+
  • twitter
  • facebook

বরিশালে সাংবাদিকতায় কাজী বাবুল অধ্যায়

বরিশাল টাইমস রিপোর্ট৭:৩৮ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ২১, ২০১৭

সাপ্তাহিক সুগন্ধার বরিশাল ব্যুরো চিফ হিসেবে যার নিয়োগ ঠেকাবার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছি সেই কাজী নাসির উদ্দিন বাবুল বহু বছর ধরে বরিশালে মিডিয়া কিং হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। বরিশাল আমার জেলা, জম্মভূমি; প্রচণ্ড আবেগের স্থান। কেবল আমি একা নই, নানান ক্ষেত্রে কাজী বাবুল অনেকেরই বিরোধিতার মুখোমুখি হয়েছেন। আর এসব প্রতিবন্ধকতা মোকাবিলা করেই প্রতিষ্ঠা লাভ করেছেন তিনি। এখনো ক্লান্তিহীন ভাবে বৈরী পরিবেশ মোকাবিলা করেই টিকে আছেন উত্তাল সাগরে দক্ষ নাবিকের মতো। বরিশালে ইত্তেফাকের ব্যুরো চিফ লিটন বাশারের অকাল মৃত্যুর পর বিরোধিতার তীব্রতা কিছুটা কমেছে। বছর খানেকের মধ্যে এ বৈরিতার ধারা শূন্যের কোঠায় নামবে অথবা তার আধিপত্যের ধারা ধসে যাবে তাসের ঘরের মতো- এমনই মূল্যায়ন অনেকের।

১৯৭১ সালে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় থেকে অব্যাহতভাবে নেতিবাচক আলোচনায় আছেন কাজী বাবুল। বিশেষ করে বিবির পুষ্কনির পশ্চিম পাশে মোল্লা বাড়ির ঘটনা কৃষক লীগ নেতা খান আলতাফ হোসেন ভুলুসহ অনেকেই এখনো স্মরণে রেখেছেন। ১৯৭৪ সালে বিচিত্রায় প্রকাশিত ছবিও অধ্যাপক নোমান-উর-রশিদসহ অনেকের স্মৃতিতে অম্লান রয়েছে। এর উপর এখনো বরিশালে বৈরী ইমেজ মোকাবিলা করেই টিকে আছেন কাজী বাবুল, আছেন শক্ত অবস্থানেই। আর কেবল টিকে থাকা নয়; বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় তিনি ক্ষমতার শীর্ষ সারিতে শক্ত অবস্থান করে নিয়েছিলেন। ২০০১-২০০৬ মেয়াদে সরকারের সময় তারেক-মামুনের সঙ্গে ছিলো তার একান্ত ঘনিষ্ঠতা। তারা তিনজন প্রায়ই দুপুরে খাবার একত্রে খেতেন। এমনকি হাওয়া ভবনের উল্টো দিকে তার অফিসও ছিল সার্বক্ষণিক কাছে থাকার সুবিধার জন্য। এই বাবুল যখন বরিশালে সুগন্ধার ব্যুরো চিফ হতে চাইলে আমি না বলে দিলাম, সম্ভবত ১৯৯১ সালে। কিন্তু তিনি হাল ছাড়েননি; কোন বিষয়ে হাল ছাড়ার পাত্রও তিনি নন। আমাকে বাইপাস করে মালিকের কাছে গেলেন। সেখানেও ঠেকাবার চেষ্টা করলাম, কিন্তু সবই নিষ্ফল।

বিএনপি-জামায়াত সরকারের সময় ক্ষমতার শীর্ষ সারিতে অবস্থানকারী কাজী বাবুলের ধুলায় লুটোপুটি খাবার অবস্থা হয় সামরিক বাহিনী সমর্থিত ইয়াজউদ্দিন-ফখরুদ্দিনের সরকারের সময়। সে অবস্থাও কাটিয়ে উঠতে বেশি সময় লাগেনি তার; তবে তাকে অনেক সম্পত্তি হারাতে হয়েছে। এদিকে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় রাষ্ট্র কাঠামোতে সুবিধা করতে না পারলেও বরিশালের বাস্তবতায় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাবে তিনি এখনো ক্ষমতাধর হিসেবে পরিচিত। এ ক্ষমতার মুকুটে নতুন পালক যুক্ত হয়েছে মাস কয়েক আগে এক বিচারপতিকে মধ্যমনি করে অনেকের সঙ্গে তার গ্রুপ ছবি। ক্ষমতা বলয়ে থাকার ক্ষেত্রে তার মালিকানার পত্রিকার চেয়ে প্রেসক্লাবের নেতৃত্ব প্রধান অবলম্বন বলে ধারণা অনেকের। ঘুরেফিরে অনেক বছর প্রেসক্লাবের নেতৃত্বের রয়েছেন কাজী বাবুল। এ ক্ষেত্রে লিটন বাশার কিছুটা প্রতিবন্ধকতা হিসেবে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তবে বাবর আলীর রহস্যজনক ‘আত্মহত্যা’ ও লিটন বাশারের প্রশ্নবিদ্ধ অকাল মৃত্যুর পর প্রেসক্লাবের রাজনীতিতে তিনি এখন দৃশ্যত অপ্রতিরোধ্য।

নানান ধরনের বৈরিতা মোবিলা করে প্রতিষ্ঠা পাবার ক্ষেত্রে কাজী বাবুলের সুনিপুণ পরিকল্পনা, একাগ্রতা ও নির্ভুল কৌশল কাজ করেছে। এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন মাত্রার ক্ষমতাধররা তার সহায়ক হয়েছেন। তবে নগ্নভাবে সহায়ক ছিলেন ১৯৯১ সালের ১ জানুয়ারী থেকে ৯৩ সালের ২১ মার্চ পর্যন্ত বরিশালের প্রথম ডিআইজি জিয়াউদ্দিন আহমেদ। এ পুলিশ কর্মকর্তার এমন কিছু বৈশিষ্ট্য ওপেনসিক্রেট ছিল যা একজন উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তার জন্য বড়ই বেমানান। সেই সময় কাজী বাবুলের হিমালয় হোটেল ও ডিআইজি জিয়াউদ্দিন আহমেদ সমর্থক হিসেবে পরিচিত ছিলেন বরিশালে। এই ডিআইজিকে প্রতিপক্ষের সাংবাদিক দমনে ব্যবহার করার অভিযোগ আছে কাজী বাবুলের বিরুদ্ধে।

বেশি কিছু নয়; পুলিশ অনর্থক প্রতিপক্ষের সাংবাদিকদের বাসা ঘিরে রাখতো অথবা গলিতে অনেক পুলিশ অবস্থান করতো। কেবল হয়রানি নয়, সাংবাদিকদের জন্য পিকনিকসহ নানান ধরনের বিনোদনেরও ব্যবস্থা করেছিলেন কাজী বাবুল। সে সময় যে সাংবাদিকরা বেশি হয়রানির শিকার হয়েছেন তাদের মধ্যে প্রধান হচ্ছেন ইসমাইল হোসেন নেগাবান ও নাসিমুল আলম। এরপরও ১৯৯২ সালে ইসমাইল হোসেন নেগাবান সেক্রেটারি থাকা কালে কাজী বাবুল বরিশাল প্রেসক্লাবের সদস্য হয়েছেন; এই প্রাপ্তি তার অন্য রকম উত্থানের স্বর্ণদ্বার খুলে দিয়েছে।

বরিশালের প্রথম ডিআইজ জিয়াউদ্দিন আহমেদের ওপেন সিক্রেট অনৈতিক কর্মকাণ্ডের খবর সুগন্ধায় গেদুচাচার চিঠিতে আমি তুলে ধরেছিলাম। যা সে সময়ের রাষ্ট্রপতি, সদ্য প্রয়াত আবদুর রহমান বিশ্বাসের নজরে পড়ে। ফলে ডিআইজিকে বেশ বেকায়দায় পড়েন। এ ব্যাপারে প্রতিবাদ ছাপার জন্য তিনি ঢাকায় এসে সৈয়দ মোয়াজ্জেমের সাথে দেখা করেন। প্রথমে অনুরোধ এবং পরে ভয়ও দেখিয়েছিলেন সুগন্ধা মালিককে। এই ভয় দেখিয়েই ভুল করেছিলেন পুলিশ কর্মকর্তা। মোয়াজ্জেম সাহেব বলেছিলেন, ‘সাংবাদিকদের ওপর মালিক হিসেবে আমি কিছু চাপিয়ে দিলে পত্রিকা চলবে না; বেশি চাপ দিলে তারা আরও বেশি লিখবে, আমার বিরুদ্ধেও লিখতে পারে! তার চেয়ে যা হবার হয়েছে, এখানেই শেষ করেন; চুপচাপ থাকেন, প্রেসিডেন্টকে আপনার ব্যাপাওে বলবো।’ উল্লেখ্য, রাষ্ট্রপতি আবদুর রহমান বিশ্বাসের সঙ্গে সৈয়দ মোয়াজ্জেমের খুবই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল, যা আমার নিজের দেখা।

ডিআইজি জিয়াউদ্দিন আহমদের প্রতিবাদ ছাপার বিষয়টি ঠেকানো গেলেও বরিশালের ব্যুরো চিফ হিসেবে দায়িত্ব নেবার ক্ষেত্রে কাজী বাবুলকে প্রতিহত করা যায়নি। আমি রাজি না হওয়ায় আমাকে বাইপাস করে মালিকের কাছ থেকে নিয়োগ লাভ করেন তিনি। আর নিয়োগ লাভের আগেই তিনি তার অফিসে ‘বরিশালের ব্যুরো চিফ’ হিসেবে নেম প্লেট লাগিয়েছিলেন। শুধু তাই নয়, তিনি খুবই ঘনিষ্ঠ হয়েছিলেন সৈয়দ মোয়াজ্জেম হুসাইনের। এ ঘনিষ্ঠতার সময় কাজী বাবুল আমার বিরুদ্ধে নানান কানপড়া দিয়েছেন অথবা আদৌ দেননি- এ বিষয়টি আমার জানা নেই। তবে তার বিরোধিতা করায় সৈয়দ মোয়াজ্জেম আমার ওপর বেশ বিরক্ত হয়েছিলেন; এ বিষয়ে আদ্যপান্ত জানার সুযোগ হয়েছে আমার।

এদিকে অনেককে বিস্মিত করে দিয়ে কাজী বাবুল আমার সঙ্গে কখনো বিরূপ আচরণ করেননি। বরং সাপ্তাহিক সুগন্ধা বন্ধ হয়ে যাবার পর তিনি বরিশালে তার পত্রিকা আজকের বার্তায় যোগ দেবার প্রস্তাব দিয়েছিলেন অতি আপনজনের মতো। লোভনীয় প্রস্তাব। বেতন দেবার কথা বলেছিলেন প্রায় অর্ধ লক্ষ টাকা; সঙ্গে ফুল টাইম গাড়িও। কিন্তু আমি রাজি হইনি। হয়তো আমি তখন ঢাকা ছাড়তে চাইনি অথবা আস্থা আনতে পারিনি তার কথায়। এর মধ্যে কোনটি প্রধান ছিল তা বলা কঠিন।

অনেকেরই জানা আছে, বিরোধীদের অতি মমতা ও সম্মানে কাছে টেনে নিয়ে আবার ছুড়ে দিয়ে মধুর প্রতিশোধ নেবার প্রবনতা আছে কাজী বাবুলের। এ প্রক্রিয়ায় বরিশালের আজকে অনেক মহিরুহু সাংবাদিকের ‘লেজ কাটা’যাবার মতো অবস্থা হয়েছে। এটি এখন সবাই জানে। আমিও জেনেছি এসব উদাহরণ দেখে, অনেক পরে। এ অবস্থায় ২০১৭ সালের মাঝামাঝি সময় একদিন বাড়িধারা ডিওএইচএস-এ তার অফিসে জনাব বাবুলের আহ্বানে আমরা অনেক সময় আন্তরিক আড্ডা দিই। ফাঁকে ফাঁকে তিনি অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকে ফোন করলেন। এদের মধ্যে খালেকুজ্জামান ফারুকও ছিলেন, যিনি মাইটিভির জিএম হিসেবে কিছু দিন দায়িত্ব পালন করেছেন; যার কাছে আমার পেশাগত কৃতজ্ঞতা অনেক।

প্রায় দেড় ঘণ্টা আড্ডার পর কাজী বাবুল আমাকে তার পত্রিকা আজকের বার্তায় গেদু চাচার খোলাচিঠি লেখার প্রস্তাব দিলেন। এর আগে এ নিয়ে তিনি ফেসবুকে নক করেছেন। বিষয়টি আমার কাছে স্পষ্টতই ফাঁদ মনে হয়েছে। কিন্তু আমি তার প্রস্তাবের অসম্মান করিনি। বলেছি, ‘লেখালেখি নিয়ে আমার খুব ব্যস্ততা আছে; এখনই রুটিন কাছে যেতে চাই না। বর্তমান ব্যস্ততা কাটতে বছর খানেক সময় লাগবে।’ আমি যতই বিনয়ের সঙ্গে বলি, কথার সারমর্ম তিনি ঠিকই বুঝেছেন। তার মতো মেধাবী লোক আমি কমই দেখেছি। এরপরও আমাদের আড্ডা আর এগোয়নি। শুনেছি কাকে ময়ুর পুচ্ছ পরার মতো তার পত্রিকায় গেদু চাচার খোলাচিঠি ছাপা শুরু হয় আমি অসম্মতি জানাবার তিন/চার দিনের মধ্যে। তবে এটিকে ছাপিয়ে ব্যাপক আলোচিত হচ্ছে গাড়ির চালক ‘পালিয়ে যাওয়া’ নিয়ে তার পত্রিকায় প্রকাশিত সিরিজ রিপোর্ট ও বিজ্ঞাপন। মালিক হিসেবে পত্রিকার ব্যবহার এমন পর্যায়ে নামিয়ে এনেছেন তিনি!

কাজী বাবুলের প্রথম ও দ্বিতীয় প্রস্তাব গ্রহণ না করার বিষয়টি ঘটেছে আমার সহজাত প্রবণতার বিপরীতে দাঁড়িয়ে। কেননা মালিক পক্ষের কথা বিশ্বাস করার ক্ষেত্রে কৃতদাসসুলভ এক ধরনের ক্ষতিকর প্রবণতা আছে আমার। কিন্তু ২০১৭ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি মাইটিভি থেকে বিদায়ের পর এ প্রবণতা থেকে অনেকটাই মুক্ত হতে পেরেছি বলে মনে হয়। যে কারণে এরই মধ্যে বেশ কয়েকটি প্রস্তাবকে ‘না’ বলতে পেরেছি যথেষ্ট বিনয়ের সঙ্গে। কারণ পানি দিয়ে যেমন দধি হয় না, তেমনই স্বল্প পুঁজিতে টেলিভিশন বা পত্রিকা হয় না। এটি আমার মৌলিক উপলব্ধি বহু আগের। কিন্তু কাজী বাবুলের প্রস্তাব কোন্ উপলব্ধিতে এড়িয়ে গিয়েছিলাম তা বলা কঠিন।

অনেকে মনে করেন, বরিশালের সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে কাজী বাবুল এক বিষ বৃক্ষ। যার আগ্রাসী প্রভাবে বরিশালে সাংবাদিকতার চরম অবক্ষয় হয়েছে; যে ধারা অব্যাহত। আবার এর বিপরীত ধারণাও পোষণ করেন অনেকে। তারা বক্তব্য, সুন্দর পরিবেশে সাংবাদিকদের অফিসে বসা, দুই টাকার পুরির বদলে কুড়ি টাকার মোঘলাই খাবার ধারা, মাস শেষে নিয়মিত নির্দিষ্ট অংকের বেতন পাওয়া- বরিশালে এর প্রবর্তক কাজী নাসির উদ্দিন বাবুল। শুধু তাই নয়, দুই যুগেরও বেশি সময় আগে প্রতিষ্ঠিত তার দৈনিক আজকের বার্তায় কাজ করার সুবাধে অনেক সাংবাদিক সৃষ্টি হয়েছে বরিশালে।

যাদের মধ্যে অনেকে জাতীয় দৈনিক ও টেলিভিশনের প্রতিষ্ঠিত সাংবাদিক; অনেকে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন স্থানীয় অনেক দৈনিকে সম্পাদক ও পত্রিকার গুরুত্বপূর্ন দায়িত্ব পালনে দক্ষ সাংবাদিক হিসেবে। কেউ আবার দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন জাতীয় পর্যায়ে। সাংবাদিক সৃষ্টির ক্ষেত্রে কাজী বাবুলকে অনেকেই তুলনা করতে চান নাঈমুল ইসলাম খানের সঙ্গে; পার্থক্য কেবল মাত্রার। আরো এক ধরনের পার্থক্য করেন অনেকে। সেটি হচ্ছে, নাঈমুল ইসলাম খানের সৃষ্টিতে কোনো আগাছা নেই; কিন্তু কাজী বাবুলের দেখানো পথে বরিশালে যত সাংবাদিক তৈরি হয়েছে তার চেয়ে অনেক বেশি সৃষ্টি হয়েছে সাংবাদিকতার আগাছা ও বিষবৃক্ষ!

লাইভ

টপ