• Youtube
  • google+
  • twitter
  • facebook

ফেসবুকে ‘বরিশাইল্যা রেনেসাঁ’

বরিশাল টাইমস রিপোর্ট৮:৩৮ অপরাহ্ণ, মে ১৮, ২০১৬

একটি শহরে হাজারো সমস্যার মোকাবিলা করতে হয় এর নাগরিকদের। প্রায়ই তাঁরা বোঝেন না, ঠিক কোথায় বা কার কাছে গিয়ে সমাধান চাইতে হবে। ফলে বাড়তে থাকে সমস্যার পাহাড়। তবে বরিশাল শহরে দেখা মিলবে এক ব্যতিক্রম দৃশ্যের। জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে নিজেদের সমস্যার কথা লিখে দিলেই চলবে। যথাযথ কর্তৃপক্ষ স্বেচ্ছায় এসে সমাধান করবে সেসবের।

তবে এ জন্য বরিশালবাসীকে হতে হবে ফেসবুকের একটি নির্দিষ্ট গ্রুপের সদস্য। গ্রুপটির নাম Barisal – Problem & Prospect বা বরিশাল – সমস্যা ও সম্ভাবনা। এই গ্রুপটিতে শহরের নাগরিকরা প্রতিদিনই নানা রকম অভিযোগ নিয়ে হাজির হচ্ছেন। যত দ্রুত সম্ভব সেসব সমস্যার সমাধানও হচ্ছে।

এর মধ্যে যেসব সমস্যা জটিল আকার ধারণ করছে, সেগুলো কীভাবে সমাধান করা যায়, তা নিয়েও আলোচনা-পরামর্শ চলছে নাগরিকদের সঙ্গে।

একটি পরিচ্ছন্ন শহর তৈরি করতে ফেসবুকে বসে এভাবেই কাজ করে যাচ্ছেন বরিশালের জেলা প্রশাসক এবং শহরটির নাগরিকরা।

বিষয়টি অবাক করার মতো হলেও আসলেই এমনটি ঘটছে। একটি ফেসবুক গ্রুপ হয়ে উঠেছে বরিশালের সমস্যা সমাধান ও সম্ভাবনার অন্যতম এক আশ্রয়স্থল। ২১ হাজারের বেশি সদস্যের এই গ্রুপটির অ্যাডমিন হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন জেলা প্রশাসক গাজী মোহাম্মদ সাইফুজ্জামান। কয়েক তরুণ-যুবক স্বেচ্ছাসেবীকে সঙ্গে নিয়ে একটি ফেসবুক গ্রুপ দিয়ে বরিশালবাসীকে ঘুরে দাঁড়ানোর বার্তা দিচ্ছেন তিনি।

বরিশালের এই ফেসবুক গ্রুপটি এখন রীতিমতো জেলার জনপ্রিয়তম গণমাধ্যমে পরিণত হয়েছে। যেখানে উঠে আসছে বরিশালবাসীর জীবনযাপনের নিত্যচিত্র, উঠে আসছে সমস্যা-সম্ভাবনার গল্প। সেই সঙ্গে উঠে আসছে অবহেলা আর বিড়ম্বনার নানা চিত্রপটও।

আর এসব খবরের সূত্র ধরেই সমাধানের দিকে এগোচ্ছে কর্তৃপক্ষ।

পাবলিক এই গ্রুপটিতে গিয়ে দেখা যায়, গ্রুপজুড়ে নানা ধরনের পোস্ট। কোনো পোস্টে কেউ অভিযোগ করছেন কোচিং-বাণিজ্য নিয়ে, কেউ বা বলেছেন কোন এলাকায় বখাটের উৎপাতের কথা। কেউ আবার অভিযোগ করছেন রাস্তার অবস্থা খুবই বাজে কিংবা দখল হয়ে যাওয়া ফুটপাতের কথা, কেউ বা জানাচ্ছেন তাঁদের গলিতে বিদ্যুতের খুঁটি থাকলেও লাইট না থাকার কথা। আবার কেউ কেউ দখল হয়ে যাওয়া খালগুলো মুক্ত করার আহ্বান জানাচ্ছেন।

এভাবেই মাদক থেকে শিক্ষা, বৈদ্যুতিক বাতি থেকে দখল হওয়া খাল উদ্ধারের আবেদনের কথা উঠে আসছে এই ফেসবুক গ্রুপের মাধ্যমে।

সে সঙ্গে শহরকে পরিচ্ছন্ন রাখা, সুন্দর রাখার বিষয়ে পরামর্শও দিচ্ছেন তরুণ স্বেচ্ছাসেবীরা। আর জেলা প্রশাসক এসব পোস্ট নিজেই মনিটরিং করে সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নেন সংশ্লিষ্টদের নিয়ে। কখনো বা কমিউনিটি তৈরি করে এলাকাভিত্তিকভাবেই সমস্যার সমাধান করা হয়।

শুধু তা-ই নয়, জেলা প্রশাসক এর সঙ্গে যুক্ত করছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদেরও। সম্প্রতি জেলা প্রশাসকের উদ্যোগে সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন ওয়ার্ডের কমিশনারদের মোবাইল ফোন নম্বর এই গ্রুপে পোস্ট করা হয়। এলাকাভিত্তিকভাবে কোনো সমস্যা হলে সঙ্গে সঙ্গে যাতে সরাসরি সহজেই কমিশনারদের ফোন করতে পারেন স্থানীয় বাসিন্দারা, সে জন্যই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়।

গ্রুপটি খোলার পেছনে শুরুর গল্প জানতে চাইলে গ্রুপ ক্রিয়েটর অ্যাডমিন হাফিজুর রহমান দিপু জানান, ডিসি অফিসে একটি সভায় বরিশালের নাগরিক সমস্যা বিষয়টি আলোচনায় উঠে আসে। কীভাবে সহজেই নাগরিকদের অভিযোগ-অনুযোগ, সমস্যার কথা শোনা যায় এবং তা সমাধানে এগিয়ে আসা যায়, তা নিয়ে আলোচনার একপর্যায়ে ফেসবুক গ্রুপটি তৈরির প্রস্তাব আসে। সে সময় জেলা প্রশাসক নিজেই গ্রুপটি আনুষ্ঠানিকভাবে পরিচালনার উদ্যোগ নেন।

এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৫ সালের ১৩ আগস্ট এই গ্রুপ খোলা হয়। এর পর এর সঙ্গে যুক্ত হতে থাকেন শহরের তরুণ-যুবকরা। ফেসবুকিং করতে করতেই আলোচনা শুরু হয়ে যায়। প্রথমে অনেকে বিষয়টি বিশ্বাস করতে না চাইলেও ধীরে ধীরে এই গ্রুপটিই হয়ে উঠেছে শহরবাসীর আস্থার জায়গা।

কারণ, সমস্যা সমাধানে নিজেই উদ্যোগী হয়ে মাঠে নেমেছেন জেলা প্রশাসক গাজী মোহাম্মদ সাইফুজ্জামান। কখনো তিনি সমস্যা অনুযায়ী যথাযথ কর্তৃপক্ষকে সরাসরি নির্দেশ দিচ্ছেন, আবার কখনো নিজেই শহরের জ্যেষ্ঠ নাগরিকদের ডেকে আলোচনায় বসছেন। তাই সমস্যার পাশাপাশি এখন সম্ভাবনার অনেক গল্পও যুক্ত হচ্ছে এই ফেসবুক গ্রুপে।

দিপু হাফিজুর রহমান আরো বলেন, ‘এই গ্রুপটির মাধ্যমে আমরা একটি সামাজিক মেলবন্ধন সৃষ্টির মাধ্যমে বরিশালের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের পথ খুঁজে বের করছি। শুধু অভিযোগ দিয়েই চুপ করে বসে থাকা নয়, নিজেরাও এগিয়ে আসছে সমাধান করতে। আর এসব কিছুই সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন জেলা প্রশাসক মহোদয়।’ বর্তমান জেলা প্রশাসক বরিশাল থেকে বদলি হয়ে গেলেও এই প্রক্রিয়া চলমান থাকবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

কোন ভাবনা থেকে এই ফেসবুক গ্রুপ খোলা হলো জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক গাজী মোহাম্মদ সাইফুজ্জামান এনটিভি অনলাইনকে বলেন, ‘আমরা দেখলাম যে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ ফেসবুকে কানেকটেড। নাগরিকসেবার ক্ষেত্রে মানুষকে কানেক্ট করার জন্য আমরা গ্রুপটি চালু করি। প্রথমে কিছু সদস্য ছিল, কিছু সমস্যা যোগ হলো। আমরা সমস্যার সঙ্গে সম্পৃক্ত বিভাগগুলোতে চিঠি দিয়ে বা ফোন করে সমস্যার কথা জানালাম। যেসব সমস্যার সমাধান হলো সেগুলো আমরা ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে জানাই। এভাবে দেখা যায় মানুষের সম্পৃক্ততা বাড়ছে। সমস্যার সমাধান হতে শুরু করেছে। ধীরে ধীরে আমাদের গ্রুপের সদস্য সংখ্যা ২১ হাজার ছাড়িয়েছে। আমরা অসংখ্য সমস্যার সমাধান করেছি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম যে মানুষের সেবা প্রদান প্রক্রিয়াকে দৃশ্যমান করতে পারে, সেটার উদাহরণ সৃষ্টি হয়েছে।

এ ছাড়া সরকারের অনেকগুলো গণমুখী কাজের শুরুতে সে সম্পর্কে ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে জনসাধারণের প্রতিক্রিয়া ও মতামত নেওয়া হয়েছে। এরপর সে অনুযায়ী সেবা দেওয়া হয়েছে।

এই কাজ করতে গিয়ে কোনো অসহযোগিতার মুখোমুখি হতে হয়েছে কি না, জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক বলেন, আসলে এটা একটা প্ল্যাটফর্ম। এখানে যে শতভাগ সমাধান হয় তা নয়। কিন্তু একটা জনসচেতনতা যখন সৃষ্টি হয়, তখন সেটা সমাধান করা সহজ হয়। মানুষ যখন সমস্যা সম্পর্কে অবগত হয়, বারবার পোস্ট দেয়, কমেন্ট করে তখন সংশ্লিষ্ট বিভাগের ওপর একটা সামাজিক চাপ তৈরি হয়। ফলে কাজটা সহজে হয়ে যায়। সে কারণে এখন পর্যন্ত কোনো বিষয়েই সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়নি।

বরিশালের এই সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে বাংলাদেশের অনেক জেলা প্রশাসকরা এই ধরনের কাজ শুরু করতে যাচ্ছেন বলেও জানালেন গাজী মোহাম্মদ সাইফুজ্জামান। তিনি জানান, কিছুদিন আগে বরিশাল বিভাগীয় এক সম্মেলনে মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে এই গ্রুপের সাফল্যের কথা জানানো হয়। তখন তিনি বিভাগের অন্য সব জেলা প্রশাসকদের এভাবে গ্রুপ খোলার নির্দেশ দেন। এখন বরিশাল বিভাগের সব জেলা প্রশাসকরা এই ধরনের একটি গ্রুপ পরিচালনা করছেন। এ ছাড়া বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলার প্রশাসকরা পর্যায়ক্রমে এই ধরনের গ্রুপ খুলবেন বলেও পরিকল্পনা করেছেন বলে জানান সাইফুজ্জামান।

একটা ফেসবুক গ্রুপও যে সমাজ গঠনে ও সামাজিক বিকাশের ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে, বরিশাল-সমস্যা ও সম্ভাবনা গ্রুপটি যেন তারই উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

বরিশালবাসী এই গ্রুপটিকে ‘বরিশাইল্যা রেনেসাঁ’ নামে ডাকতে শুরু করেছেন। এই ভার্চুয়াল দরজা দিয়ে অবাধে তারা প্রবেশ করছেন জেলা প্রশাসকের কক্ষে। তাঁকে জানাচ্ছেন নিজেদের স্বপ্ন আর স্বপ্নের পথে বাধার কথা। আর জেলা অভিভাবক হিসেবে সেসব গল্প শুনে সমাধানে এগিয়ে আসছেন এবং অন্যদেরও এগিয়ে আনছেন।

 

সূত্র- এনটিভি

লাইভ

টপ