• Youtube
  • google+
  • twitter
  • facebook

নতুন উপহারের অপেক্ষায়

বরিশাল টাইমস রিপোর্ট১২:৪৮ অপরাহ্ণ, মার্চ ১৪, ২০১৬

ক্রিকেটের সংক্ষিপ্ততম আসরের বিশ্বকাপ মানেই যেন শিহরণ জাগানো নিত্য নতুন উপহার পাবেন ক্রিকেটপ্রেমীরা। টি২০ বিশ্বকাপের বয়স এখনও এক দশক পেরোয়নি। এরই মধ্যে নিত্যনতুন সব ঘটনার জন্ম দিয়ে ভিন্ন এক আকর্ষণের কেন্দ্রে চলে এসেছে টি২০ বিশ্বকাপ। ২০০৭ সালে প্রথম আসরে নতুনত্বের ছোঁয়া প্রতিটি আসরেই অনুভব করছেন ক্রিকেটপ্রেমীরা। প্রতিটি আয়োজনই হাজির হচ্ছে নতুনের পসরা সাজিয়ে।

প্রথম আসরেই চমকে দিল টি২০ বিশ্বকাপ। ফাইনালে মুখোমুখি চিরপ্রতিদ্বন্দী ভারত-পাকিস্তান। বিশ্ব ক্রিকেটে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন ভারত-পাকিস্তান দ্বৈরথ। এই দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীকে কোন বৈশ্বিক আসরের ফাইনালে দেখার স্বপ্ন দেখেন না, এমন একজনকেও খুঁজে পাওয়া যাবে না ক্রিকেট দুনিয়ায়। তিন দশকেরও বেশি বয়সী ওয়ানডে বিশ্বকাপের এগারো আসরে একটিবারের জন্যও ফাইনালে মুখোমুখি হয়নি ভারত-পাকিস্তান। অথচ প্রথম আসরেই সেই স্বপ্ন পুরণ করে দিল টি২০ বিশ্বকাপ। বৈশ্বিক আসরে পাকিস্তান-ভারত ফাইনাল ম্যাচের উত্তাপ কেমন হওয়া উচিৎ তারও যেন একটা মানদণ্ড জোহান্সবার্গের নিউ ওয়ান্ডারার্স স্টেডিয়ামের ওই ফাইনাল। ২০০৭ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর ফাইনালের সেই তুঙ্গস্পর্শী উত্তেজনাকে বর্ননা করার জন্য স্নায়ুক্ষয়ী, নাটকীয়তা এই ধরনের বিশেষণগুলোও যথেষ্ট নয়। ক্ষণে ক্ষণে রং বদলানো ওই ম্যাচে শেষ ওভারে জয়ের জন্য পাকিস্তানের প্রয়োজন ছিল ১৩ রানের। অখ্যাত পেসার যোগিন্দর শর্মার সামনে পাকিস্তানের ইনফর্ম ব্যাটসম্যান মিসবাহ-উল-হক। প্রথম বলটি ওয়াইড। দ্বিতীয় বলটিকে স্ট্রেট শূন্যে ভাসিয়ে সীমানা ছাড়া করলেন মিসবাহ। জয়ের জন্য সমীকরণ দাঁড়ালো ৪ বলে ৬ রান। ম্যাচ হেলে পড়েছে পাকিস্তানের দিকে। তৃতীয় বলে শর্ট ফাইন লেগের উপর দিয়ে স্কুপ শট খেলতে গিয়ে শ্রীশান্তের হাতে ধরা পড়লেন মিসবাহ। ৫ রানে হেরে শিরোপা হাতছাড়া করল পাকিস্তান।

ফাইনালের আগে গ্রুপ পর্বে এই দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ভিন্ন এক উপহার দিলো ক্রিকেটকে। ওই আসরে নতুনভাবে সংযোজিত হয় ক্রিকেটের টাইব্রেকার বোল আউট। ম্যাচ টাই হলে ফলাফল নিস্পত্তির জন্যই টাইব্রেকারের ক্রিকেটীয় সংযোজন বোল আউট। এটার আদৌ প্রয়োগ হবে কি না এ নিয়ে সংশয়ে ছিলেন অনেকেই। তবে সত্যি কখনো কখনো হার মানায় কল্পনাকেও। ম্যাচে দু’দলই রান করলো ১৪১। ‘ডি’ গ্রুপ সেরা নির্ধারণীর জন্য বাইলজ অনুযায়ী অনুসরণ করা হলো বোল আউট পদ্ধতির। ভারতের পক্ষে বীরেন্দর শেবাগ, হরভজন সিং, ববিন উথাপ্পা তাদের ডেলিভেরিতে বল স্ট্যাম্পে লাগাতে পারলেও সফল হতে পারেননি পাকিস্তানের একজনও। বল স্ট্যাম্পে লাগাতে একে একে ব্যর্থ হলেন ইয়াসির আরাফাত, উমর গুল ও শহীদ আফ্রিদি। ক্রিকেটের টাইব্রেকারে পাকিস্তানকে ৩-০ ব্যবধানে হারালো ভারত। পরবর্তীতে ম্যাচ নিস্পত্তির জন্য বোল আউটের বদলে চালু করা হয় সুপার ওভার।

ক্রিকেটে সবচেয়ে বিরল ঘটনা বোধ হয় এক ওভারে ছয় ছক্কা দেখা। আর বিশ্বকাপের মতো আসরে ৬ বলের প্রতিটিতেই ছক্কা দেখার আকাঙ্খা, স্বপ্ন গোপনে লালন করে থাকেন অনেকেই। ক্রিকেটপ্রেমীদের সেই স্বপ্ন পূরণ করেছে টি২০ বিশ্বকাপ। প্রথম বিশ্বকাপেই ইংলিশ ইংলিশ পেসার স্টুয়ার্ট ব্রডের এক ওভারে ছয় বলকেই ওভার বাউন্ডারি মারার গৌরবের অধিকারী হলেন ভারতীয় হার্ডহিটার যুবরাজ সিং।

একটা সময় মনে করা হতো, ক্রিকেটের কোন বৈশ্বিক আসরে ইংল্যান্ডের শিরোপা জয় দেখাটা ডুমুরের ফুল দেখার মতোই একটি ব্যাপার। আর এ কারণে ইংল্যান্ড ফাইনালে উঠলেও অনিবার্যভাবেই ফেভারিট হিসাবে বিবেচিত হতো প্রতিপক্ষ শিবির। ওয়ানডে বিশ্বকাপে তিন তিনবার ফাইনালে হেরেছে ইংলিশরা। শিরোপা জিততে না পারার এই ঐতিহাসিক অপবাদ ইংল্যান্ড ঘুঁচিয়েছে টি২০ বিশ্বকাপেই। ২০১০ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজে অনুষ্ঠিত তৃতীয় আসরে ভক্তদের আক্ষেপ দূর করলো ইংল্যান্ড।  ব্রিজটাউনের ওই ফাইনালে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী অস্ট্রেলিয়াকে ৭ উইকেটে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন অনুভূতির সঙ্গে পরিচিত হলেন ইংলিশ ক্রিকেটাররা।

ক্রিকেট তো বটেই বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনের কোন বৈশ্বিক আসরে প্রতিবারই নতুন চ্যাম্পিয়ন দেখাটা প্রায় অবিশ্বাস্য একটা ব্যাপার। অথচ টি২০ ক্রিকেট প্রতি আসরেই উপহার দিচ্ছে একটি করে নতুন চ্যাম্পিয়ন দল। আরও সহজ করে বললে, টি২০ বিশ্বকাপের পাঁচ আসরে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে পাঁচটি নতুন দল। ক্রিকেটের এই সংক্ষিপ্ততম আসরে এখন পর্যন্ত কোন দলই দু’বার শিরোপা জয়ের স্বাদ পায়নি। প্রথম টুর্নামেন্টে ভারত, এরপর একে একে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার কাতারে নাম লিখিয়েছে পাকিস্তান, ইংল্যান্ড, ওয়েস্ট ইন্ডিজ এবং সর্বশেষ শ্রীলংকা।

নতুন চ্যাম্পিয়ন হওয়ার একটা রেওয়াজ অলিখিতভাবে দাঁড় করিয়েছে টি২০ বিশ্বকাপ। আর ঠিক এই জায়গাটিতে আশাবাদী হতেই পারে চির দুর্ভাগা দক্ষিণ আফ্রিকা। বৈশ্বিক আসরগুলোতে ধারাবাহিকভাবে ব্যর্থ হওয়ার কারণে দক্ষিণ আফ্রিকার নামের সঙ্গে সেঁটে গেছে চোকার্স অপবাদ। ক্রিকেটের সবচেয়ে ধারাবাহিক প্রোটিয়ারা এই ভেবে অনুপ্রাণিত হতে পারে, টি২০ ক্রিকেটর কল্যাণে ঐতিহাসিক দায়মুক্তি ঘটেছে ইংলিশ ক্রিকেটের। সুতরাং তারাও পারবে। নতুন চ্যাম্পিয়ন উপহার দেয়ার যে ধারা টি২০ বিশ্বকাপে এটাই ঐতিহাসিক দায়মোচনে পাথেয় হতে পারে প্রোটিয়াদের। তাদের সামনে উদাহরণ হতে পারে ওয়েস্ট ইন্ডিজও। পঞ্চাশ ওভারের ক্রিকেটে উইন্ডিজরা যে দু’বারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন তা মানুষ ভুলতেই বসেছিল। ২০১২ টি২০ বিশ্বকাপে ঠিক ৩৩ বছর পর শিরোপা জিতে মনে করিয়ে দিয়েছে তারা পঞ্চাশ ওভারের ক্রিকেটে দু’বারের চ্যাম্পিয়ন।

অনেকের কাছেই টি২০ বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় উপহার মাহেলা জয়াবর্ধনে-কুমারা সাঙ্গাকারা যুগলের শিরোপার স্বাদ পাওয়া। বাংলাদেশে ২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত সর্বশেষ আসরের আগ পর্যন্ত ক্রিকেট বিশ্বে এক বড় আক্ষেপ হয়েছিলেন সাঙ্গাকারা-মাহেলাদের বিশ্বকাপ শিরোপা বঞ্চিত থাকাটা। মাহেলা-সাঙ্গাকারার নামের পাশে বিশ্বকাপ শিরোপা থাকবে না, এটা মেনে নেয়াটা কষ্টকর ছিল অনেকের জন্যই। ঢাকার মিরপুর দূর করল এই ঐতিহাসিক আক্ষেপ। গত আসরের সেমিফাইনালে বৃষ্টিবিঘ্নিত ম্যাচে শ্রীলঙ্কার কাছে হারার পর ওয়েস্ট ইন্ডিজ অধিনায়ক ড্যারেন স্যামি বলেছিলেন, ‘এবারের বিশ্বকাপ শিরোপা ঈশ্বর লিখে রেখেছেন মাহেলা-সাঙ্গাকারার নামে।’ ফাইনালে ভারতকে হারিয়ে ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপে জীবনের সবচেয়ে বড় উপহারটাই পেলেন মাহেলা-সাঙ্গাকারা। বুকের পাথর নেম গেল ভক্তদেরও। আর এটা সম্ভব হল টি২০ বিশ্বকাপের সৌজন্যেই।

লাইভ

টপ