• Youtube
  • google+
  • twitter
  • facebook

তিনি সর্বরোগের ডাক্তার?

বরিশাল টাইমস রিপোর্ট১০:১০ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ৬, ২০১৭

আকুলাইভ ‘প্রি-প্যালথজিক্যাল ডায়াগনস্টিক ডিভাইস’ শরীরের বিভিন্ন অংশে ধরে রোগ নির্ণয় করে সর্বরোগের চিকিৎসার নামে কয়েক লাক টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এমনকি গ্রামের সহজ সরল মানুষের সাথে দীর্ঘদিন থেকে প্রতারণাও করে আসছে একটি প্রতারক চক্র। গত বৃহস্পতিবার ওই চক্রের কতিথ এক চিকিৎসককে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করেছে এলাকাবাসী। কিন্তু কোন অদৃশ্য ক্ষমতাবলে শুক্রবার দুপুরে পুলিশ তাকে ছেড়ে দিয়েছে।

বরিশালের গৌরনদী পৌর এলাকার টরকী বন্দর আনোয়ারা প্রি-ক্যাডেট স্কুল সংলগ্ন সমিতির মাঠের একটি দ্বিতল ভবনের নিচতলার ভাড়াটিয়া বাসায় ‘তিয়ানশি বাংলাদেশ কোম্পানি লিমিটেড’ নামে একটি কার্যালয় স্থাপন করে দীর্ঘদিন থেকে প্রতিদিন সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলে রোগী দেখা, ওষুধ বিক্রয় ও সদস্যদের মোটিভেশনসহ যাবতীয় কার্যক্রম।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, এমএলএম পদ্ধতিতে সদস্য সংগ্রহ করে লোভনীয় পুরস্কারের প্রলোভন দেখিয়ে সহজ সরল মানুষকে তিয়ানশি নামে বিপনন কার্যক্রমে যুক্ত করা হয়। ওই কোম্পানির ওষুধ সেবন ও অন্যান্য সামগ্রী ব্যবহার করে নিরীহ জনসাধারণ একদিকে যেমন মারাত্মক জটিলরোগে আক্রান্ত হচ্ছেন তেমনি আর্থিকভাবে হয়েছেন সর্বশান্ত। অথচ ফুড সাপ্লিমেন্টারীর নামে চিকিৎসায় ব্যবহৃত এসব সামগ্রীর নেই সরকারের ওষুধ প্রশাসন, খাদ্য বিভাগ কিংবা বিএসটিআইয়ের কোন প্রকার অনুমোদন। চিকিৎসার ক্ষেত্রে ওষুধ ও ফুড সাপ্লিমেন্টারী ব্যবহারে বাংলাদেশ মেডিকেল এন্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) অনুমোদিত চিকিৎসক কর্তৃক ব্যবস্থাপত্র প্রদানের আইন থাকলেও স্বাস্থ্য ঝুঁকির চিন্তা না করে মনগড়াভাবে ব্যবস্থাপত্র দিয়ে যাচ্ছেন তিয়ানশি’র সাথে সংশ্লিষ্ট স্বল্পশিক্ষিত কথিত চিকিৎসকরা। যাদের কারোর ই চিকিৎসার ওপর কোন ডিগ্রি নেই। দীর্ঘদিন থেকে ভূয়া চিকিৎসার মাধ্যমে বেআইনী ফুড সাপ্লিমেন্টারী চড়া দামে ক্রয়ের পর ব্যবহার করে শত শত মানুষ ক্ষতির সম্মুখীন হলেও প্রশাসনের কর্তা ব্যক্তিরা রয়েছেন নিরব দর্শকের ভূমিকায়।

গৌরনদী পৌর এলাকার টরকী বন্দর জামে মসজিদ পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও বিশিষ্ট ব্যবসায়ী আলহাজ্ব মামুন সিকদার সাংবাদিকদের জানান, তিনি গত তিন মাস পূর্বে শারিরিক অসুস্থতার জন্য তিয়ানশি থেকে তাদের ব্যবস্থাপত্র মোতাবেক কিছু ওষুধ ক্রয়ের পর তা সেবন করে গুরুতর অসুস্থ্য হয়ে পড়েন। একপর্যায়ে অবস্থার অবনতি হলে স্বজনরা তাকে ঢাকার হার্টফাউন্ডেশনে ভর্তি করেন। সেখানে দীর্ঘ চিকিৎসায় তিনি সুস্থ্য হয়ে কয়েকদিন পূর্বে বাড়িতে ফিরেছেন।

স্থানীয় স্কুল শিক্ষক শিরিনা বেগম তিয়ানশি থেকে ৩০ হাজার টাকা ব্যয়ে বিভিন্ন রোগের ওষুধ ক্রয় করেছেন। শিরিনা বেগম জানান, শরীরের বিষ ব্যথাসহ অন্যান্যরোগ নিরাময়ের ওষুধসহ উচ্চ রক্তচাঁপ থেকে রেহাই পেতে তিয়ানশি’র চিরুনী ক্রয় করেছেন কিন্তু পণ্য ব্যবহার ও ওষুধ সেবনে তিনি কোন উপকারই পাননি। একইভাবে নানা প্রলোভনে পরে স্থানীয় কামরুন নাহার তিয়ানশি থেকে ক্রয় করেছেন ২৩ হাজার টাকার ওষুধ ও পণ্য। সিমা আক্তার ১২ হাজার টাকার, নন্দনপট্টি গ্রামের আব্দুর রাজ্জাক ৯৫ হাজার, জেসমিন আক্তার ১০ হাজার, সিরাজুল ইসলাম ২৬ হাজার টাকার তিয়ানশি’র ওষুধ ও অন্যান্য পন্য এবং নুরুজ্জামান মুন্সি ছয় হাজার টাকায় ক্রয় করেছেন মাথা ব্যাথা নিরাময়ের মেশিন।

একইভাবে গৌরনদী পৌর এলাকার ১ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম, নন্দনপট্টি গ্রামের তারিন আহম্মেদ, ব্যবসায়ী হায়দার সিকদার, বাবুল হোসেন, গৃহিনী খালেদা পারভিন, কালকিনির বাবুল সরদার, রমজানপুর গ্রামের আলমাস বেপারী, বেজগাতীর জুলহাস মুন্সিসহ অসংখ্য ব্যক্তিরা প্রত্যেকেই ডায়াবেটিস, কিডনী, হৃদরোগসহ অন্যান্য জটিল রোগের জন্য চড়া দামে তিয়ানশি’র ওষুধ সেবন ও অন্যান্য সামগ্রী ক্রয় করে প্রতারিত হয়েছেন। এসব ওষুধ সেবনে কোন উপকারতো হয়নি। বরং প্রত্যেকেরই শারিরিক অবস্থার অবনতি হয়েছে বলে উল্লেখিতরা অভিযোগ করেন।

খোঁজখবর নিয়ে জানা গেছে, এমএলএম পদ্ধতিতে সদস্য সংগ্রহের মাধ্যমে মুনাফা ও লোভনীয় পুরস্কারের লোভ দেখিয়ে স্থানীয় কতিপয় ব্যক্তি গ্রামের সহজ সরল মানুষকে তিয়ানশির বিপনন কার্যক্রমে যুক্ত করেন। বিক্রয় কাজে দক্ষতা ও সদস্য অন্তভূক্তির সাফল্য অনুযায়ী একজন সদস্য ফাষ্ট ষ্টার থেকে শুরু করে এইট ষ্টার র‌্যাংক পর্যন্ত হতে পারেন। র‌্যাংক অনুযায়ী পুরস্কারের মাধ্যমে ল্যাপটপ, বিদেশ ভ্রমণ, প্রাইভেটকার, বিলাসবহুল বাড়ির লোভনীয় অফার দেয়া হয়।

সূত্রমতে, গৌরনদী উপজেলায় সংগঠনের সার্বিক দায়িত্ব পরিচালনা করছেন সেভেন ষ্টার র‌্যাংকধারী নোয়াখালীর পারভেজ মাহমুদ ও মুন্সিগঞ্জের রমজান শেখ রবিন। রোগী দেখা, রোগ নির্ণয় ও ব্যবস্থাপত্র প্রদানসহ অন্যান্য কার্যক্রম তারা দুইজনেই করে থাকেন। ব্যবস্থাপত্র লেখার কোন বৈধ কাগজপত্র রয়েছে কিনা জানতে চাইলে পারভেজ মাহমুদ বলেন, ডাক্তার সাহেব ভিতরে রয়েছেন। কিছু সময়ের মধ্যে সে কৌশলে পালিয়ে গেলেও প্রতারিতরা রমজান শেখ রবিনকে আটক করে বৃহস্পতিবার রাতে থানা পুলিশের কাছে সোপর্দ করেন।

তিয়ানশির রোগ নির্ণয়ের ধরণ ও ওষুধের মান সম্পর্কে জানতে চাইলে গৌরনদী উপজেলার স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ফিরোজ হাসান বলেন, যেকোন ওষুধ অনুমোদিত ডাক্তার ব্যতিত ব্যবস্থাপত্র দেয়া আইনত দন্ডনীয় অপরাধ। তিনি আকুলাইভ ‘প্রি-প্যালথজিক্যাল ডায়াগনস্টিক ডিভাইস’ দিয়ে শরীরের বিভিন্ন অংশে ধরে রোগ নির্ণয়ের বিষয় সম্পর্কে এবারই প্রথম শুনেছেন বলেও উল্লেখ করেন।

আটক কথিত চিকিৎসক রমজান শেখ রবিনকে ছেড়ে দেয়ার বিষয়ে গৌরনদী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনিরুল ইসলাম বলেন, এ ব্যাপারে মামলা দায়ের করার জন্য কোন বাদী না পাওয়ায় মুচলেকা রেখে রবিনকে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। প্রতারণার ঘটনার কেউ থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”

লাইভ

টপ