• Youtube
  • google+
  • twitter
  • facebook

‘চুরির টাকায় নেশা করি’

বরিশাল টাইমস রিপোর্ট৭:০৮ অপরাহ্ণ, মার্চ ১৮, ২০১৬

দেশের পথশিশুদের দেখার কেউ নেই। পথে-ঘাটে বেড়ে উঠছে অনাদরে, অবহেলায়, অযত্নে। কেউ কোন খোঁজ খবর নেয় না। চেয়েচিন্তে চলে ভরণপোষন। এদের কেউ পিতৃ-মাতৃহীন, কেউবা দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত। আবার অনেকের অভিভাবকরা নিজেরাই মাদকাসক্ত। জীবন অনিরাপদ। হরহামেশায় শিকার হচ্ছে যৌন নির্যাতনের। জুটছে কিল-চড়-ঘুসি।

দিন শেষে চুরি করে বা চেয়ে-চিন্তে যা জোটে, তা দিয়ে কেউ নেশা করে, কেউ ভাত খায়। এমনকি অসুস্থ মায়ের ওষুধও কেনে কেউ কেউ।

আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষনা কেন্দ্র বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি) এর জরিপ বলছে, দেশে প্রায় সাড়ে ৪ লাখের মতো পথশিশু রয়েছে। বাস্তবে এই সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণেরও বেশি। এসব শিশুরা অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসাসহ সব ধরনের সুবিধা বঞ্চিত।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবজ্ঞিান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মনিরুল ইসলাম খান র্পূবপশ্চমিকে বলেন, ‘সমাজের এসব ছিন্নমুল শিশুরা অনেক ক্ষেত্রে নিজেরাই নষ্ট হচ্ছে। আবার অনেক সময় মা-বাবার কারণে নষ্ট হচ্ছে।মা-বাবারা শিশুদের দিয়ে আয় করাচ্ছে।এসব শিশুদের ভিতরে শিক্ষার আলো জ্বালাতে হবে। সামাজিকভাবে মেডিটেশন করে অন্ধকার ছেড়ে আলোর পথে আনতে পারলে তবেই সমাজের অবক্ষয় ঠেকানো যাবে।’

বৃহস্পতিবার সকালে কমলাপুর রেল ষ্টেশন এলাকায় সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, শহর প্লাটফর্মের শেষ প্রান্তে বসে চার শিশু পলিথিনে ভরে আঠা নাকে টেনে (ড্যান্ডি) নেশা করছে। অনিক, খালেক, মাসুম, নাহিদ নামের এই শিশুগুলোর বয়স ১০ থেকে ১২ বছরের মধ্যে। দিনে পলিথিন কাগজ, প্লাস্টিকের বোতল, কাঁচের ভাঙ্গা জিনিস কুড়িয়ে ভাঙ্গারির দোকানে বিক্রি করে। তারপর সেই টাকায় কেনা মাদক দিয়ে নেশা করছে।

নিজেদের জীবন-যাপন সম্পর্কে জানতে চাইলে ১১ বছরের অনিক বলে, ‘আমাগো খাওন লাগে। হামরা কুড়ায়ে খাই। আমাগো নেশার টাকা জোগাড় করলেই চলে। খাওন কুড়ায়ে কমমে খাই।’

বুধবার মধ্যরাতে দয়াগঞ্জ ব্রিজের নিচে একটি প্রাইভেট কারের লুকিং গ্লাস ভেঙে নিয়ে পালানোর সময় গাড়ির চালক ধরে ফেলে ১০ বছরের শিশু শ্যামলকে। ড্রাইভার মারতে চাইলেও বাধা দেয় মালিক।

ছাড়া পেয়ে এই প্রতিবেদককে শ্যামল বলে, ‘মাঝে মধ্যে গাড়ির গেলাস ( লুকিং গ্লাস) খুলে ধোলাইখালে বিককির করি। হেই টাকা দিয়ে মার ওষুধ কেনন লাগে। ভাত খাওন লাগে।’

জানা যায়, বাবা মারা গেলে পাঁচ বছর আগে বরিশাল থেকে ঢাকায় আসে শ্যামল ও তার মা। মায়ের বুকের অসুখ হওয়ায় মাঝে মধ্যে আরও পথশিশুদের সঙ্গে মিশে সে গাড়ির গ্লাস চুরি করে। তারপর তা ধোলাইখালে বিক্রি করে ৫০ থেকে ৮০ টাকায়। সেই টাকা দিয়ে মার জন্য খাবার কিনে নিয়ে যায়।

সদরঘাট এলাকায় ঘুরলেই চোখে পড়ে অনেক ছিন্নমুল শিশুদের। এদেরই একজন বশির। গত বুধবার সন্ধ্যার পর তাকে দেখা যায় নৌকাঘাটে। কাছে যেতেই বোঝা গেলো ধুমপান নয়, সে গাঁজা সেবন করছে। তার সম্পর্কে জানতে চাইলে বশির নিংসংকোচে বলে, সারাদিন বোতল টোকাই, ভাঙ্গারি দোকানে বোতল বেইচ্যা দেই। মাঝে মধ্যে নৌকায় মাল তুলি। পরদিন ৮০ থেকে ১০০ টাকা কামাই। ৪০ টাকা দিয়ে ভাত খাই । আর বাকি টাকা দিয়া নেশাভান করি।’

মা-বাবার কথা জানতে চাইলে বশির জানায়, মা-বাবা নাই। সড়ক দূর্ঘটনায় মারা গেছে। তারপর থেকে সদরঘাটেই বসতি গেড়েছে শিশুটি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান জিয়া রহমান বলেন, ‘ঢাকা শহরের যেসব ছিন্নমুল শিশু রয়েছে তারা বেশিরভাগই ছোট খাট কোন না কোন অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। ছোটবেলায় থেকেই প্রয়োজনে অথবা অন্যের প্ররোচনায় অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। এদেরকে সঠিকভাবে কাউন্সিলিং করে শিক্ষায় আগ্রহী করে তুলতে হবে। তবেই এই প্রবণতা কমে আসবে।’

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এসব শিশুদের পুর্নবাসনে সরকারী বেসরকারী কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের কিছু উদ্যোগ থাকলেও তা কাজে আসছে না। কমছে না সদরঘাট বা কমলাপুর বা রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে গাড়িতে ভিক্ষা করা বা নেশা করা শিশুদের সংখ্যা। তাদের ভাগ্যেরও পরিবর্তন হচ্ছে না।

লাইভ

টপ