• Youtube
  • google+
  • twitter
  • facebook

ঘুরে আসুন বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জ উলানিয়া জমিদার বাড়ি

বরিশাল টাইমস রিপোর্ট১:২০ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১০, ২০১৮

প্রায় দেড়’শ বছর আগে ইংরেজী ১৮৬১ সালে বর্তমান বরিশাল মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলার উলানিয়া গ্রামে এ মসজিদটি নির্মিত হয়। নির্মাণের আলাদা বৈশিষ্টের কারণে এই মসজিটি সবার দৃষ্টি কেড়েছে। সর্বশেষ ২০১১ সালের মে মাসে মসজিদটি সংস্কার করা হয়। সংস্কার শেষে মসজিদটি পর্যটকসহ সবার প্রশংসা লাভ করেছে।

মসজিদটির গোড়ার কথা
পঞ্চদশ সালের গোড়ার কথা এতদ অঞ্চল ছিল মগ-পর্তুগীজ জলদস্যুদের আক্রমনে পর্যুদস্ত। এই মগ হার্ম্মাদদের প্রধান কেন্দ্র ছিল চট্টগ্রাম-সন্দ্বীপ। অতঃপর এদের দমনের উদ্দেশে মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেব সুবেদার শায়েস্তা খানকে পাঠান। শায়েস্তা খান তার পুত্র উমেদ খান ও বিশাল রনতরী সৈন্য গোলাবারুদ নিয়ে জলদস্যু প্রতিহত করতে এগিয়ে আসেন। মেহেন্দিগঞ্জের গোবিন্দপুরে কেল্লা তৈরী করা হল। স্থানীয়ভাবে যা সংগ্রাম কেল্লা নামে পরিচিত ছিল। এই অভিযানে মো. হানিফ নেতৃত্ব দিয়ে বীরত্ব প্রদর্শন করেন। মগ-পর্তুগীজ-হার্ম্মাদরা বিতারীত হলেন। কিন্তু পারস্য বংশোদূত হানিফ খান এদেশে ভালোবেশে থেকে গেলেন। মো. হানিফের এক কন্যা সন্তান ছিল।

মো. হানিফের ভ্রাতস্পুত্র ও জামাতা এবং উত্তরাধিকারী শেখ মো. হাবিজ পরবর্তিকালে সংগ্রাম কেল্লা থেকে সামান্য পশ্চিমে উলানিয়া অঞ্চলে এসে বসবাস করেন। মো. হাবিজের পুত্র শেখ মোঃ সদরুদ্দিনের আমলেই মূলত উলানিয়া জমিদারি প্রতিষ্ঠিত হয়। তার ৩ পুত্র ছিল। এরা হলেন- নয়া রাজা চৌধুরী, কালা রাজা চৌধুরী ও হাসান রাজা চৌধুরী। তাদের সময়েই বসত বাড়িটিকে উঁচু প্রাচীর ঘেড়া দুর্গের মত করে নির্মাণ করা হয়। এরপর বাড়ির প্রধান ফটকের পাশেই নির্মাণ করা হয় একটি মসজিদ। এটিই মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলার উলানিয়া জামে মসজিদ নামে পরিচিত।

মসজিদটির বৈশিষ্ট
১৮৬১ সালে প্রতিষ্ঠার পর মসজিদটি কয়েকবার সংস্কার করা হলেও মূল অবয়ব এখনও অক্ষুন্ন রয়েছে। ৩ গম্বুজ বিশিষ্ঠ এই মসজিদটি অনেক অনেকটা তাজমহল আকৃতির। মসজিদের সামনে বাধানো চওরা, পুকুর রয়েছে। মূল গৃহের আগে লোহার ৬ খামের ওপর প্রতিষ্ঠিত জাফরির কাজ রয়েছে। এখানে বীমের ছাদ রয়েছে। মসজিদের তিনটি দরজা। মসজিদের ভিতরে একসাথে শতাধিক মুসল্লি নামাজ পড়তে পারে। মসজিদের আর একটি বৈশিষ্ট রয়েছে যা তাকে অন্য মসজিদের থেকে আলাদা করেছে। সেটি হলো মসজিদ গাত্রে শিলালিপি। এই মসজিদ গাত্রের পুরোনো শিলালিপীটি এখন আর নেই। তবে একই রকম শিলালিপী উৎকীর্ণ রয়েছে। মসজিদের বাহিরের গাত্রে চিনে মাটির টুকরা দিয়ে গড়া রয়েছে। মসজিদটি মূলত মোগলরীতিতে তৈরী। ভেতর ও বাহিরের গাত্রে জ্যামিতিক লতাপাতা ও ফলের নকশা রয়েছে।

শিলালিপি
মসজিদে মূল নামাজ ঘরে ৩টি প্রবেশ পথ রয়েছে। ৩টি দরজার মধ্যে মাঝেরটি অপেক্ষাকৃত বড় এবং এটির দুই পার্শ্বের দুই দেয়ালে নকশার নীচে উৎকীর্ণ শিলালিপি ছিল। ডানদিকের দেয়ালে উৎকীর্ণ কোরাআন শরীফের আয়াত ক্ষতিগ্রস্থ হলেও অধিকাংশ লেখা টিকে আছে। বা’দিকের দেয়ালে উৎকীর্র্ণ ছিল মসজিদ প্রতিষ্ঠা বিষয়ক বক্তব্য। এগুলো নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার আগেই ফটোগ্রাফি করে রাখা হয়েছিল। অতঃপর এই ফটোগ্রাফি ব্যবহার করেই নতুন শিলালিপি খোদাই করে মসজিদের গাত্রে উৎকীর্ণ করা হয়েছে।

শিলালিপিতে ১০টি লাইন থাকলেও সবগুলো অক্ষুন্ন নেই। যেগুলো রয়েছে তার থেকে অর্থ করলে দাড়ায়- ১. প্রভু আল্লাহর ওপর ভরসা করো। ২. সর্পসংকুল চন্দ্রদ্বীপের দক্ষিণ পূর্বে প্রান্তে। ৩. শোকে পরিশুদ্ধ মানুষ। ৪. নামাজের জন্য রাজ্যে মসজিদ নির্মাণ করে। ৫. নয়া রাজা, কালা রাজা, হাসন রাজার বসতিতে। ৬. বারশ’ আটষট্টি সনে। ৭ৃৃৃ। ৮. নামাজ পড়া শুরু করল। ৯. মসজিদে। ১০..।

শেষ কথা
১৯৯৩ সালে প্রত্নতত্ব বিভাগ মসজিদটিকে সংরক্ষণযোগ্য ঘোষণা করেন। জমিদারীর পক্ষে আপনজন, কিছু সংস্কার করে। ২০০৩ সালে ইঞ্জিনিয়ার হারুন অর রশিদ মসজিদ সংস্কারে ভুমিকা রাখেন। অতপর কুয়েত ভিত্তিক মসজিদে সাহায্য দানকারী প্রতিষ্ঠানের পক্ষে ইঞ্জিনিয়ার মো. এস কীওয়ান মসজিদটি সংস্কারের জন্য হাত বাড়িয়ে দিলে মসজিদের ব্যাপক সংস্কার সাধিত হয়। সংস্কার শেষে মসজিদের অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক সৌন্দয্য বহুগুনে বর্ধিত হয়। বর্তমানে মসজিদটি দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে বহু পর্যটক আসেন।

মসজিদ কমিটির সম্পাদক ইউসুফ চৌধুরী বরিশালটাইমসকে বলেন, মসজিদ কমিটি ও মুসল্লিদের সাহায্য সহযোগিতায় ৭০ হাজার টাকা ব্যয়ে সংস্কার করা হয় গত মে মাসে। তিনি আরও বলেন এছাড়াও “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙ্গানো একুশে ফেব্রুয়ারি” গানের রচয়িতা ও বিশিষ্ট কলাম লেখক আব্দুল গফফার চৌধুরী মসজিদ কমিটিকে মসজিদ সংস্কার করার জন্য ১০ হাজার টাকা অনুদান দিয়েছে।

এছাড়া সংস্কারের জন্য বড় কোন অনুদান পাইনি। পুরাকীর্তি হিসেবে মসজিদটি সংস্কারের জন্য সরকারের এগিয়ে আসা প্রয়োজন। সরকারিভাবে মসজিদটি সংস্কারের উদ্যোগ নিলে এ মসজিদটি হতে পারে দক্ষিণাঞ্চলের একটি পর্যটনকেন্দ্র।

এ ব্যপারে স্থানীয় মেহেন্দীগঞ্জ উলানিয়া ৪ নম্বর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জামাল মোল্লা বরিশালটাইমসকে জানান- মসজিদ কমিটি থেকে আমার কাছে কোন সহযোগিতা চাওয়া হয়নি। তবে আমি সব ধরনের সাহায্য ও সহযোগিতা করবো।

মসজিদটি মেঘনা নদী ভাঙনের কবলে পড়েছে। সরকার নদী ভাঙন রোধে পানি উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে ১১০ কোটি টাকা ব্যায়ে নদী ভাঙন রোধে কাজ করেছে। কিন্তু এতে কোন উপকার হয়নি। বরং নদী ভাঙন অব্যহত থাকায় ঝুঁকিতে রয়েছে মসজিদটি।’’

লাইভ

টপ